সোনার প্রাসাদের রাক্ষসী — পর্ব ২: রহস্যময় প্রাসাদের ভয়ংকর রাত

 

পর্ব ২: রহস্যময় প্রাসাদের ভয়ংকর রাত

খিদের জ্বালায় ওদের পা কাঁপছিল। বেশি ভাবার সময় নেই, চারজন ধীরে ধীরে প্রাসাদের ভেতরে ঢুকে পড়ল।

ভেতরে গিয়ে ওরা আবার অবাক। সামনে এক বিশাল খাবার ঘর, মাঝখানে লম্বা টেবিল। টেবিলের ওপর থরে থরে সাজানো কত রকম সুস্বাদু খাবার, তাজা ফল আর মিষ্টি। গরম খাবারের ঘ্রাণে ঘর ম ম করছে। সে ঘ্রাণ নাকে আসতেই কেউ আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না।

সবুজ ফিসফিস করে বলল,

— "এত খাবার কে সাজিয়ে রেখে গেল? অথচ কোথাও একটা মানুষও নেই!"

রহিম চারদিকে একবার চোখ বুলিয়ে বলল,

— "কে রেখেছে জানি না। আগে পেটটা ঠান্ডা করি, বাকিটা পরে দেখা যাবে।"

চার বন্ধু গোগ্রাসে খেতে বসে গেল। কতদিন পর এমন খাবার পেটে পড়ল! খাওয়া শেষে মনটাও একটু হালকা হলো। তখন ওরা প্রাসাদটা ঘুরে দেখতে বেরোল। প্রতিটি ঘর, প্রতিটি বারান্দা, প্রতিটি কোণা খুঁজে দেখল। কিন্তু কেউ নেই। মনে হলো, এই বিশাল প্রাসাদে ওরা চারজন ছাড়া আর কোনো প্রাণই নেই।

হঠাৎ ওদের চোখ পড়ল প্রাসাদের বাইরের দেয়ালের পাশে। সেখানে একটা ছাগল বাঁধা। একা, চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে।

করিম অবাক হয়ে বলল,

— "মানুষই যখন নেই, তখন এই ছাগলটাকে বাঁধল কে?"

কেউ উত্তর দিতে পারল না।

দেখতে দেখতে সন্ধ্যা নেমে এল। চার বন্ধু বুঝে গেল, আজ রাতটা এখানেই কাটাতে হবে। ঘুমানোর জায়গা খুঁজতে গিয়ে ওরা পেল চারটি সুন্দর ঘর। প্রতিটিতে নরম বিছানা, ধবধবে চাদর আর তুলতুলে বালিশ। এমন বিছানা দেখে ক্লান্ত শরীর আর জেগে থাকতে পারল না। চারজন চারটি আলাদা ঘরে শুয়ে পড়ল, আর একটু পরেই গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল।

পরদিন সকালে প্রথমে ঘুম ভাঙল রহিমের। উঠেই সে করিমের ঘরে উঁকি দিল। ঘর খালি। বিছানার ওপর শুধু চাদরটা পড়ে আছে।

— "করিম কোথায় গেল?"

পুরো প্রাসাদ তন্নতন্ন করে খুঁজেও করিমকে পাওয়া গেল না।

সবুজ বলল,

— "হয়তো বাড়ির কথা মনে পড়েছে। আমাদের না বলেই চলে গেছে।"

সুফল মাথা নাড়ল,

— "হ্যাঁ, তাই হবে।"

কিন্তু রহিমের মন মানল না। এই প্রাসাদে এমন অনেক কিছু ঘটছে, যার কোনো ব্যাখ্যা নেই। যেমন, প্রতিদিন নতুন নতুন খাবার তৈরি হয়ে যাচ্ছে। ওরা যখনই খাবার ঘরে আসে, দেখে টেবিলে গরম খাবার সাজানো। কিন্তু কে রাঁধে? কে এনে রাখে? কেউ জানে না।

আরও একটা দিন কেটে গেল। রাত নামল। সুফল আর সবুজ নিজের নিজের ঘরে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। কিন্তু রহিমের চোখে ঘুম নেই। বিছানায় শুয়ে একটা প্রশ্নই তার মাথায় ঘুরপাক খেতে লাগল,

"করিম গেল কোথায়?"

সকালে উঠে দেখা গেল, সুফলও নেই!

সবুজ আবার বলল,

— "হয়তো ওরও বাড়ির কথা মনে পড়েছে।"

এবার রহিম আর বিশ্বাস করতে পারল না। বুকের ভেতর কেমন একটা ঠান্ডা ভয় জমে উঠল। সে মনে মনে ভাবল, মানুষ নেই, অথচ খাবার তৈরি হয়। বন্ধুরা একে একে হারিয়ে যাচ্ছে। আর ওই ছাগলটা, দিনের পর দিন একই জায়গায় বাঁধা। এই প্রাসাদের ভেতরে নিশ্চয়ই কোনো ভয়ংকর রহস্য লুকিয়ে আছে।

সেদিন রহিম ঠিক করল, আজ রাতে সে ঘুমাবে না। নিজের চোখে দেখবে, এখানে আসলে কী ঘটে।

রাত গভীর হলো। চারদিক এমন নিস্তব্ধ যে নিজের বুকের ধুকপুক শব্দও কানে আসছিল। রহিম দরজার ফাঁকে চোখ রেখে নিঃশব্দে বসে রইল।

হঠাৎ মাঝরাতে সে দেখল, বাইরে বাঁধা সেই ছাগলটা ধীরে ধীরে দড়ি খুলে প্রাসাদের ভেতরে ঢুকছে।

রহিম নিঃশ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে রইল। তারপর যা দেখল, তাতে তার সারা শরীর থরথর করে কেঁপে উঠল। ছাগলটার শরীর বদলাতে শুরু করেছে। দেখতে দেখতে সে এক ভয়ংকর রাক্ষসীর রূপ নিল!

রাক্ষসী পা টিপে টিপে সবুজের ঘরের দিকে এগিয়ে গেল। তারপর সব চুপ। শুধু একটা ভয়ানক নীরবতা।

রহিম বুঝে গেল, তার বন্ধুরা কেউ বাঁচেনি। হাত-পা অবশ হয়ে আসছিল। সে দাঁতে দাঁত চেপে মনে মনে বলল,

"সকাল হলেই এখান থেকে পালাব। যেভাবে হোক, বাঁচতেই হবে।"

সারা রাত তার চোখে আর পলক পড়ল না। ভোরের প্রথম আলো ফুটতেই সে চুপিচুপি ঘর থেকে বেরিয়ে ঘোড়ার পিঠে চড়ে বসল। তারপর প্রাণপণে ঘোড়া ছুটিয়ে দিল।

কিন্তু সে জানত না, রাক্ষসীর চোখ তার ওপর পড়ে গেছে।

রাক্ষসী নিজের আসল রূপে রহিমের পিছু নিল। রহিম জীবনের শেষ শক্তি দিয়ে ঘোড়া ছোটাতে লাগল। ছুটতে ছুটতে একসময় সে এক নতুন রাজ্যের সীমানায় এসে পৌঁছাল।

রাক্ষসী থমকে গেল। এই রূপে লোকালয়ে ঢুকলে মানুষ তাকে চিনে ফেলবে। তাই সে মুহূর্তে এক অপরূপ সুন্দরী নারীর রূপ ধরল। তারপর ছুটে এসে বুক চাপড়ে কাঁদতে শুরু করল,

— "ওগো স্বামী! আমাকে ছেড়ে কোথায় যাচ্ছ গো? আমাকে একা ফেলে যেও না!"

কান্নার শব্দে চারদিক থেকে লোকজন ছুটে এল। নারী ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলল,

— "এই মানুষটা আমাকে বিয়ে করেছে। এখন আমাকে ফেলে পালিয়ে যাচ্ছে!"

রহিম চিৎকার করে কিছু বলতে চাইল, কিন্তু কেউ তার কথা শুনল না। লোকজন তাকে ঘিরে ধরে আটকে ফেলল। শেষে রহিম আর সেই রহস্যময় নারীকে নিয়ে যাওয়া হলো রাজদরবারে।

শুরু হলো তাদের বিচার...

চলবে...


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

সোনার প্রাসাদের রাক্ষসী-পর্ব ১ | বাংলা রূপকথার গল্প

বালির দানার অভিশাপ — একটি নৈতিক ও কল্পকাহিনি